Showing posts with label যুক্তরাষ্ট্র. Show all posts
Showing posts with label যুক্তরাষ্ট্র. Show all posts

Wednesday, February 21, 2007

আমেরিকার উল্টোরথ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে আসার আগে এক জায়গা থেকে ভারতীয়দের তৈরী করা একটি টিপস্-সাজেশন নোট (বুয়েটিয় পরিভাষায়, “চোথা“) পেয়েছিলাম, যার বিষয়বস্তু ছিলো কী করে ভারতীয়রা যারা পড়তে বা চাকরিতে যাচ্ছে, তারা ওখানে খাপ খাওয়াবে। ওখানে একটা পরামর্শ ছিলো, ভারতীয় উপমহাদেশে বিভিন্ন কাজ যেভাবে করা হয়, এখানে অনেক কিছুই পুরাপুরি তার উল্টা ভাবে করা হয়।

আমি ভেবেছিলাম চাপা। রাস্তায় গাড়ি ডানদিকে চলে, এটা তো ছোট বেলা থেকেই নাইট রাইডার সিরিজ দেখে শেখা। কিন্তু অন্য আর কী হতে পারে?

এখানে এসে দেখলাম, ঘটনা সত্যি। প্রথম কয়েকদিন ডিপার্টমেন্টের করিডোরে হাঁটার সময় বিভিন্ন মানুষের সাথে ধাক্কা লাগার উপক্রম। তার পর বুঝলাম, হাঁটার সময়ও ডান দিকে করে চলতে হবে, আমি অভ্যাস বশত বাঁ দিকেই হাঁটছিলাম।

রাস্তা পার হবার সময় দেশে বলা হয়, ডানে বামে তাকাতে। কারন দেশে রাস্তা পার হওয়ার সময় গাড়ি তো ডান দিক থেকেই আসবে। এখানে উল্টা, আগে বামে, তারপর ডানে। (আমার এক মার্কিনী বন্ধুকে বলেছিলাম, বললো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সেনারা যারা ইংল্যান্ডে পোস্টেড ছিলো, তাদের অনেকেই শুরুতে খালি গাড়ি চাপা পড়তো। কারণ এটাই)

এর পর ধরা যাক বাতির সুইচ। যথারীতি উপরে উঠালে জ্বলে, নীচে নামালে নিভে। প্লাগ পয়েন্টে পিন থাকলে আর্থের পিনটি নীচের দিকে।

ঘরের চাবি। দেশে সাধারনত খাঁজ কাটা অংশটা নীচে রেখা চাবি ঢুকাই, তাই না। এখানে তার উল্টা।

এক মাস কাটিয়ে দেশ থেকে ফিরে এসে প্রথম বার গাড়ি চালাতে গিয়ে অস্বস্তি হচ্ছিলো একটু। যাক অল্প পরেই আবার উল্টো রথের দেশে মানিয়ে গেছি।

[লেখাটি সামহয়ারইনব্লগে ২০০৭/২/৩ তারিখে প্রকাশিত]

বরফ চাপা চৌরাস্তা

তুষারপাত আমার একদম ভালো লাগে না। এক মার্কিন ছেলেকে বলেছিলাম এই কথা, আরো বলেছিলাম যে বরফের একমাত্র স্থান হলো ডীপ ফ্রিজের ভিতরে। এটা বলাতে ব্যাটা বেশ নাখোশ হয়েছিলো, পরে শুনেছিলাম ওর বাড়ি আলাস্কাতে।

যাহোক, ছবিটা দেখুন, গত রবিবার জানালার কাঁচটা তুলে গলা বের করে তুলেছিলাম। স্টপ সাইন বরাবর অংশটি রাস্তা, যদিও আশে পাশের সবকিছু একই রকম মনে হচ্ছে। আসলে স্টপসাইনের জায়গাটা একটা চৌরাস্তা। দেখে কি বুঝতে পারছেন সেটা?

এবছর বরফ নাকি গড়ে কম পড়ছে, কিন্তু এক দিনে সাড়ে চার ইঞ্চি বরফ পড়াতে এই দশা। তুলার মতো বরফ, উড়ে উড়ে আসাতে অনেক খানে আরো গভীর। বাসার সামনের অনেক স্থানে তো পা ফেললে প্রায় ফুট দেবে যাচ্ছে। আর রাতের বেলা -১৫ সেঃ তো স্বাভাবিক তাপমাত্রা হয়ে দাড়িয়েছে।

গরম কালের অপেক্ষায় আছি। আপাতত শীতনিদ্রা যেতে পারলে মন্দ হতো না।

[লেখাটি সামহয়ারইনব্লগে ২০০৭/২/৯ তারিখে প্রকাশিত]

Tuesday, February 20, 2007

ধন্যবাদের সংস্কৃতি

আচ্ছা, বাংলাদেশে থাকতে কেউ দিনে কতবার ধন্যবাদ বলেছেন, তা কি গুণে দেখেছেন?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর প্রথম যে সবক নিতে হয়, তা হলো কথায় কথায় থ্যাংক ইউ বলা। দোকানে গেলেন, জিনিষ খুঁজে পাচ্ছেন না, দোকানদারকে প্রশ্ন করাতে সে বললো কোথায় আছে। ব্যাস, “থ্যাংকু জিনিষ কিনে টাকা দিলেন, পয়সা ফেরত দিল, “থ্যাংকু কাউকে কিছু প্রশ্ন করলেন, ব্যাস জবাব পেলে থ্যাংকু।

আমার বাঙালি মনে তো আর ভিতর থেকে কথায় কথায় থ্যাংকু আসে না। মাঝে মাঝে এটাকে ভং মনে হয়। অথচ এখানকার সংস্কৃতিতে এটা অঙ্গাঅঙ্গী ভাবে মিশে আছে। আপনি থ্যাংকু না বললে মানুষ আপনাকে অভদ্র ভাববে, বা খাইস্টা মনে করবে।

কিন্তু এই দিনে হাজারো বার বলা থ্যাংকুর কতটুকুই বা মন থেকে বলা? দোকানদারকে টাকা দিলে ব্যাটা তো পয়সা ফেরত দিতে বাধ্য, এর মধ্যে থ্যাংকু বলার কী আছে? (থ্যাংকু' আবার জবাবও দিতে হবে, “ইউ আর ওয়েলকামবলে!!)

বাঙালি সংস্কৃতিতে ধন্যবাদ বা শুকরিয়া বলা হয় শুধু আসলেই ধন্যবাদ দেয়ার মতো কাজ করলে। দেশে কোনোদিন শুনেছেন, মা ছেলেকে বা মেয়েকে, বা উল্ট্টাটা , ধন্যবাদ বলতে, সামান্য সব কাজের জন্য? সৌজন্য বোধ ভালো, কিন্তু মেকি সৌজন্য রীতিমত বিরক্তিকর। জানিনা আমাদের সংস্কারে এটা নাই বলে এরকম মনে হচ্ছে কি না। জানিনা জার্মানি বা ইউরোপে কী দশা। কিন্তু এই মেকি ধন্যবাদের মহড়া দিতে আর ভালো লাগে না। এক মাস দেশে ছুটি কাটানোর সময় মেকি থ্যাংকু আর আনুসঙ্গিক দাঁত দেখানো নকল হাসির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। এখানে ফিরে এসে আবারো এই ভং এর সম্মুখীন হতে হচ্ছে। মন থেকে না আসলেও দন্তবিকশিত করে বিনা কারণেই বলতে হচ্ছে, কারণ এটা এখানের সংস্কারের সাথে অঙ্গাঅঙ্গীভাবে মিশে আছে।

নইলে তো আবার খবিশ বলে গালি খাওয়া শুরু করবো!

[পাদটীকাঃ সত্যিকারের ধন্যবাদ বলাতে আমার কোনোই আপত্তি নাই। কারো কাছে সাহায্য পেলে, বা রকম কাজের জন্য ধন্যবাদ দেশেও বলতাম, এখানেও বলি। কিন্তু রোবোটের মতো প্রতিটা কথার পিছনে থ্যাংকু বলতে বলতে মাথা বিগড়ে যায়। উপরের প্রলাপ এরই ফল। পড়ে থাকলে, নিন দন্তবিকশিত থ্যাংকু“ ]

[লেখাটি সামহয়ারইনব্লগে ২০০৭-২-১৩ তারিখে প্রকাশিত]

Monday, February 19, 2007

চার ধাক্কা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করার জন্য যখন আসলাম, প্রথম কয়েক দিনে কয়েকটা ধাক্কা খেলাম।

) প্রথম সন্ধ্যা। শিকাগো 'হেয়ার এয়ারপোর্টের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে নেমেছি। ইমিগ্রেশনে যথারীতি হেনস্থা, সব শেষে বেরুলাম সন্ধ্যা ৯টার দিকে। দেশে থাকতে ইন্টারনেটে সার্চ করে জেনেছিলাম, এটা আমেরিকার দ্বিতীয় ব্যস্ততম এয়ারপোর্ট (সারা বিশ্বের প্রথম ১০টি ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের মধ্যে আছে) তাই ভাবলাম রমরমা হবে, খাওয়া দাওয়া জোগাড়ে সমস্যা হবে না।

বিধি বাম। বেরুতে বেরুতে দেখি, দারোয়ানও পর্যন্ত নাই, দোকান খোলা তো দুরের কথা। রাত ১০টা নাগাদ ওখানে ভুতের টিকিটাও দেখা গেলো না। জীবনে আমার প্রথম বিমান যাত্রা, আর যেতে হবে আরো দেড়শো মাইল। রাতে বাস নাই, পরের দিন সকালে আছে। মনে পড়লো, ঢাকা এয়ারপোর্টে গভীর রাতেও মানুষে মানুষে গমগম করা অবস্থা। আর বিশ্বের ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের একটাতে কিনা সব কিছু বন্ধ।

পরে দেখেছি, এখানে অনেক কিছুই খুব তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। যেমন দোকানপাট, অফিস ইত্যাদি। দেশে মানুষ ডাক্তার দেখায় সন্ধ্যা বেলা। এখানে ডাক্তারের চেম্বার-টেম্বার থাকলে সন্ধ্যাতেই বন্ধ। আমার এখানকার ডেন্টিস্ট বিকাল পাঁচটায় অফিস বন্ধ করে, আর শুক্রবারে দুপুর ১টাতেই। শুড়িখানা ছাড়া অন্য অনেক কিছুই এখানে বন্ধ হয়ে যায় তাড়াতাড়ি।

) ক্যাম্পাসে পৌছালাম। ভুট্টাক্ষেতের এলাকা, নদী নালা কিছুই নাই, পাহাড় টিলাও নাই, পুরা চ্যাপ্টা এলাকা। তাই আগস্ট মাসে প্রচন্ড গরম, ঢাকার মতো ৩০-৩৫ডিগ্রি। দেশ থেকে বিদেশ যাত্রার সময় ব্লেজার ফরমাল প্যান্ট পরতে হবেই, এরকম আদেশ উপদেশ দেয়া হয়েছিলো। ক্যাম্পাসে নেমে নিজেকে আবুল মনে হলো। পুরা শহরে আমি বাদে আর কেউ ব্লেজার পরা নাই। (পরের বছর আমিও মজা করে দেখলাম, সামারে যেসব নতুন চীনারা আসে, তারাও শুরুতে স্যুট,টাই পরে আসে।)

ডিপার্টমেন্টে গিয়ে রিপোর্ট করলাম। এক প্রফেসর আমাকে নিতে চায় রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে, গেলাম তাঁর সাথে দেখা করতে। প্রচন্ড বিখ্যাত লোক, সুপার কম্পিউটারের গুরু, এনসিএসএ (যেখানে প্রথম ব্রাউজার বানানো হয়, আর অনেক সুপার কম্পিউটার আছে), এর ডাইরেক্টর, ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলো আগে। রুমে ঢুকে আশা করছিলাম রাশভারী স্যুট পরা কেউ হবে। দেখি গরিলার মতো দাঁড়ি ওয়ালা এক লোক টি-শার্ট, আর শর্টস পরে স্যান্ডেল পায়ে টেবিলে পা তুলে রেখেছে। এটাই সেই বিখ্যাত প্রফেসর! মনে পড়লো দেশের সব প্রফেসরদের কথা, ঢাকার গরমেও স্যুট ছাড়া অনেকে চলতেননা।

) এই প্রফেসরের গ্রুপে যোগ দিলাম। আমরা নতুন জন ছাত্র ঢুকেছি। যোগ দেয়ার এক সপ্তাহ পরে আমাদের গ্রুপের কো-অর্ডিনেটর বললো, তোমরা নতুন তিন জন ঢুকেছো, তোমাদের সম্মানে আমরা লাঞ্চ করবো, অমুক দিন দুপুরে। আগেই শুনেছিলাম, আমেরিকানদেরদাওয়াতমানে পয়সা নিজেরই খসবে। তবুওতোমাদের সম্মানার্থেশুনে ইমেইল পেয়ে আশা পেয়েছিলাম।

কিন্তু যথারীতি লাঞ্চে গিয়ে দেখলাম, প্রত্যেকে নিজে অর্ডার দিয়ে নিজের পয়সা নিজেই দিচ্ছে। পরে জানলাম এটাকে বলে ডাচ ট্রিট।

> আমার সহকর্মী এক মার্কিনী ছেলে। একদিন আমাকে বললো, এক পোস্টার সেশনে ওর পোস্টারটা আমাকেই প্রেজেন্ট করতে। জিজ্ঞেস করলাম, কেনো? বললো, ঐদিন ঐসময় নাকি ওর কুকুরের ওবিডিয়েন্স ক্লাস আছে। (মানে কুকুরকে সিট বললে বসবে, আদেশ মানবে এরকম শিক্ষা) তাই কুকুরকে নিয়ে ওকে কুকুরের স্কুলে যেতে হবে। এজন্য আর সে থাকতে পারছেনা!!!!

যাহোক, আগের পোস্টেই বলেছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলো উল্টোরথের দেশ। কাজেই এখন আর অতটা অবাক হইনা, যাই দেখি না কেনো।

[লেখাটি সামহয়ারইনব্লগে ২০০৭/২/৪ তারিখে প্রকাশিত]